কে বাঁচায় কে বাঁচে
১. “দিন দিন কেমন যেন হয়ে যেতে লাগল মৃত্যুঞ্জয়।”— মৃত্যুঞ্জয় কেমন হয়ে যেতে লাগল ? তার এমন হয়ে যাওয়ার কারণ কী ?
আথবা, তারপর দিন দিন কেমন যেন হয়ে যেতে লাগল মৃত্যুঞ্জয়।—মৃত্যুঞ্জয়ের পরিবর্তনের ছবিটি ফুটিয়ে তােলাে এবং তার লব্ধ বােধ ও অভিজ্ঞতার পরিচয় দাও।
উত্তর : মানিক বন্দোপাধ্যায়ের রচিত 'কে বাঁচায়ে কে বাঁচে' গল্প থেকে প্রশ্ন উক্ত অংশটি নেওয়া হয়েছে। পঞ্চাশের মম্বন্তরে শহরের কিরূপ অবস্থা হয়েছিল তা খুব সুন্ধর ভাবে বিশিষ্ঠ সাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায় তার গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আর এই অবস্থার কারণে গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয় কিভাবে পাল্টে যেতে লাগল তা নিচে আলোচনা করা হল।
➥ মৃত্যুঞ্জয়ের পরিবর্তন : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পের নায়ক শান্ত এবং সহানুভূতিশীল মৃত্যুঞ্জয় অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাতে একজন অনাহারী ব্যক্তির মৃত্যু দেখেন তখন তিনি মানসিকভাবে আঘাত পায় এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে লাগল মৃত্যুঞ্জয়। এই ঘটনাটি তার মনে এমন ভাবে আঘাত করেছে যে তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে সেই অনাহারী মানুষদের বাঁচানো।সেই মানুষদের বাঁচানোর জন্য মৃত্যুঞ্জয় ও তার স্ত্রী একবেলা খাওয়া ছেড়ে দেয় এবং তার মাসিক বেতনের টাকা নিখিলের দ্বারা রিলিফ ফান্ডে দান করে দেয়। ক্ষুধার্তদের জন্য সে খাবার সরবরাহ করার সর্বস্ব চেষ্টা করে। শহরের আদি-অন্তহীন ফুটপাথে, বিভিন্ন লঙ্গরখানায় ঘুরে অন্নপ্রার্থী মানুষের ভিড়ে মিশে সে জেনে নিতে চায় –“কোথা থেকে কিভাবে কেমন করে সব ওলোট পালোট হয়ে গেল”। তবে মৃত্যুঞ্জয়ের মন সমাজ ও পরিবেশের এসব পরিবর্তনের অনিবার্য পরিণতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। "কিছুই কি করা যায় না?" এই চিন্তা তাকে গভীর হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করে। এই মানসিক অশান্তির কারণে সে অফিসের কাজে অমনযোগিত হয়ে পড়ে। কিছু সময় পরথেকে দায়িত্ববোধসম্পন্ন মৃত্যুঞ্জয় দেরি করে অফিসে যায়, কাজে ভুল করে, চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ বেরিয়ে যায় অফিস থেকে।
➥ মৃত্যুঞ্জয়ের পরিবর্তনের কারণ : গল্পে বর্ণিত কাহিনিটি পঞ্চাশের মম্বন্তরের দুর্দশার কাহিনীর উপর নির্ভর করে উপস্থাপন করেছে বিশিষ্ট সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তৎকালীন সময়ে একটু খাবারের খোঁজে গ্রাম উজাড় করে মানুষ চলে আসে শহরে। অথচ লঙ্গরখানার সামনে ভিড় করে আশাহত মানুষ দু-মুঠো খাদ্য পাওয়ার আশায় লাইনে দাড়ায় এবং আদি-অন্তহীন ফুটপাথে ক্রমাগত ঘুরে বেড়ায়। ফুটপাথ জুড়ে বহু মানুষ মারা যায় খাদ্য অভাবে। এমনই এক অন্নপার্থী মানুষের মৃত্যু দেখে আলোচ্য গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয় ক্রমে ক্রমে বদলে যায়। “...আমি বেঁচে থাকতে যে লোকটা না খেয়ে মরে গেল, এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কী?” মৃত্যুঞ্জয়ের এমন আত্ম-অনুশোচনা ক্রমে তার আত্মযন্ত্রণায় পরিণত হয়। তাই নিজের ভালো থাকার চেয়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত, অসহায়, অন্নহীন মানুষগুলোকে ভালো রাখার দায়িত্ব সে নিজেই নিতে চায়। মৃত্যুঞ্জয় কী উপায়ে তাদের অবস্থার পরিবর্তন করবে এই ভাবনায় ক্রমশ নিজে বদলে যেতে থাকে।
Comments
Post a Comment
What type of content you need?