* জীবনব্যাপী শিক্ষা ধারণা, বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করো ?
জীবনব্যাপী শিক্ষার অর্থ ও ধারণা:
খুব সহজভাবে বলতে গেলে জীবনব্যাপী শিক্ষা হল “যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি”। এই শিক্ষা মনে করে শিক্ষা কেবলমাত্র বাল্যকাল থেকে কৈশোর কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে পা চালিয়ে চলতে গেলে শিক্ষার ব্যাপ্তি হবে সমগ্রজীবন- জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। এই শিক্ষার অর্থ ও ধারণা আরও স্পষ্ট হবে যদি এর বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করা যায় ।
জীবনব্যাপী শিক্ষার বৈশিষ্ট্য:
১. ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল:
এই শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই শিক্ষা স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যক্তির প্রেষণার উপর নির্ভরশীল।
২. লক্ষ্যভিত্তিক:
নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জন যেমন, কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন, পেশাগত দক্ষতা অর্জন, উচ্চতর শিক্ষা অর্জন ইত্যাদি এই শিক্ষায় প্রেষণা সঞ্চার করে।
৩. সময়কাল অনির্দিষ্ট:
এই শিক্ষাব্যবস্থায় যে সময় থেকে ব্যক্তি শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে তখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
৪. নির্দিষ্ট পাঠক্রম নেই:
এই শিক্ষায় নির্দিষ্ট এবং বাঁধাধরা কোন পাঠক্রম নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে পাঠক্রম থাকলেও তা যথেষ্ট নমনীয় হয়।
৫. স্বাধীনতা:
এই শিক্ষায় শিক্ষার্থী তার ইচ্ছা,সামর্থ্য ও ক্ষমতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার স্বাধীনতা পায়।
৬. মূল্যায়ন নমনীয়:
এই শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলেও তা যথেষ্ট নমনীয় হয়।
৭. জীবনব্যাপী শিক্ষার কোর্স:
প্রথাগত শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সের বিষয়বস্তুকে জীবনব্যাপী শিক্ষার উপযোগী করে এই শিক্ষার কোর্স রচনা করা হয়। এছাড়া বৃত্তি শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সও এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
৮. শিক্ষার সংস্থা:
প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দূর শিক্ষা ও মুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শিক্ষা সংস্থার সঙ্গে জীবনব্যাপী শিক্ষার নেটওয়ার্কে সংযোগ করা হয়।
জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা:
জ্যাক ডেলোরের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা হল জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। শিক্ষার ব্যাপ্তি সমগ্র জীবনব্যাপী হওয়ার পিছনে যে প্রয়োজনগুলি উল্লেখ করা যায়। তা হল –
১. পরিবর্তনশীল জীবন:
আমাদের জীবন পরিবর্তনশীল। বর্তমান বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই পরিবর্তন দ্রুত এবং ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। পরিবর্তনশীল জীবন ও জগতের সঙ্গে সার্থকভাবে মানিয়ে চলার জন্য নিরবচ্ছিন্ন শিখনের প্রয়োজন। যা এই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য।
২. বৃত্তি জগতে পরিবর্তন:
বর্তমানে মানুষ পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির উন্নতি, নতুন দ্রব্যের উৎপাদন ও উৎপাদনের কৌশল এবং নতুন জ্ঞান সম্মিলিতভাবে বৃত্তি জগতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। পূর্বে যে ধরনের বৃত্তির প্রয়োজন ছিল এখন তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৃত্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রকৃতির শিক্ষার প্রয়োজন যা জীবনব্যাপী শিক্ষার সাহায্যে অর্জন করা সম্ভব।
৩. সামাজিক পরিবর্তন:
দ্রুত গণমাধ্যমের ব্যবহার এবং নগরায়নের ফলে পরিবারগুলি ভেঙে ছোট ছোট হয়ে পড়ছে । ফলে নারী এবং পুরুষের ভূমিকা পরিবর্তনের ফলে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হচ্ছে। এইভাবে দ্রুত সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঠিক ভাবে চলার জন্য এই শিক্ষার শিক্ষার প্রয়োজন।
৪. সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগণ:
সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগণের চাহিদা শিক্ষার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয় না। এছাড়া এদের মধ্যে একটা বড় অংশ বিভিন্ন কারণে প্রারম্ভিক শিক্ষা সম্পন্ন হবার আগেই পাঠত্যাগ করে। এদের মধ্যে কেউ যদি পরবর্তী সময়ে শিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক হয় সেক্ষেত্রে জীবনব্যাপী শিক্ষা সাহায্য করতে পারে।
৫. জনসংখ্যার চরিত্রের পরিবর্তন:
জীবনের মান এবং উন্নত চিকিৎসার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ফলে বেশীরভাগ মানুষ বৃদ্ধ হয়ে পড়ছে। যদিও তারা উৎপাদনে সক্ষম। তাদের কর্মক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের গঠন মূলক কাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যার জন্য প্রয়োজন হল উপযুক্ত শিক্ষা। এই শিক্ষার এক্ষেত্রে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজন যে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই নয়, অপরিহার্যও হয়ে উঠেছে।
জীবনব্যাপী শিক্ষার মূলনীতি:
যে শিক্ষা কেবলমাত্র শৈশব এবং বয়সন্ধিকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এই ধারণা ত্যাগ করাই হল জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রধান ভিত্তি। প্রয়োজনীয় শিক্ষা যে কেবল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট পরিবেশে ঘটে সেই ধারণাও জীবনব্যাপী শিক্ষা সমর্থন করে না। এই শিক্ষা হল ধারাবাহিকভাবে জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্নবীকরণ এবং সেগুলিকে সাম্প্রতিকতম করা। সফল জীবনব্যাপী শিক্ষার ভিত্তি হল দুটি সাংগঠনিক নীতি- উলম্ব সমীকরণ ও অনুভূমিক সমীকরণ।
১. উলম্ব সমীকরণ:
প্রথাগত শিক্ষা এবং তার বিভিন্ন সংস্থাগুলির এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে যাতে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা একস্তর থেকে পরবর্তী স্তরে নিরবচ্ছিন্ন অগ্রসর হতে পারে। একেই বলে উলম্ব সমীকরণ (Vertical Integration)।
২. অনুভূমিক সমীকরণ:
প্রথাগত স্তরের পরের শিক্ষাকে গৃহে, কর্মক্ষেত্রে, ক্লাবে এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে এমনকি অবসর জীবনের কার্যাবলীর মধ্য দিয়ে সংগঠিত করা হয়। একেই অনুভূমিক সমীকরণ (Horizontal Integration) বলে।
এই শিক্ষা বিজ্ঞান ভিত্তিক এবং সফল করার জন্য উভয়নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা প্রয়োজন। বর্তমানে পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলিতে উভয়নীতি অপেক্ষা অনুভূমিক নীতির উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। অপরদিকে অনুন্নত এবং উন্নতিশীল দেশগুলিতে উলম্ব নীতিই প্রাধান্য পায়।
Comments
Post a Comment
What type of content you need?