
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করো। শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের সুবিধা ও অসুবিধা উল্লেখ করো।
উঃ- ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার যে লক্ষ্য নির্ধারিত হয় তাকে শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য বলে। ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক,
আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিকাশ ব্যক্তিতান্ত্রিক শিক্ষার বৈশিষ্ট। এই সমস্ত দিকের সুষ্ঠ বিকাশের মধ্যদিয়ে ব্যক্তির জীবনকে সার্থক করাই হল ব্যক্তি কেন্দ্রীক শিক্ষার লক্ষ্য।
বিশ্বের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদদের মধ্যে অনেকেই এই লক্ষ্যের সমর্থক।
এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্যার পার্সি নাথ, বাট্রান্ত, রাসেল, স্বামী বিবেকাননন্দ প্রমুখ।
১) দৈহিক বিকাশ – দৈহিক বিকাশ হল দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পেশি, অস্থি ইত্যাদির বিকাশ।
দৈহিক বিকাশের লক্ষ্যপূরণের জন্য শিক্ষা কর্মসূচীর মধ্যে উল্লেকযোগ্য হল খেলাধূলা, শারীরবিদ্যা, যোগাসন ইত্যাদি।
২) মানসিক বিকাশ – মানসিক বিকাশ বলতে বুদ্ধি, চিন্তা, কল্পনা, আগ্রহ,
মনোযোগ ইত্যাদির বিকাশকে বোঝায়। প্রধানত পাঠক্রমিক ও নির্দিষ্ট কিছু সহপাঠক্রমিক কার্যাবলির মাধ্যমে এই বিকাশ কার্যকলী হয়।
বিভিন্ন বিষয় শিখন, নানা বিষয় সম্পর্কে আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদি অণুশীলনের ফলে মানসিক বিকাশ ঘটে।
৩) প্রাক্ষোভিক বিকাশ – শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল, শিশুর আবেগ বা প্রাক্ষোভের বিকাশ যাতে যথাযথভাবে ঘটে তার ব্যবস্থা করা।
খেলাধূলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অণুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, দলগতভাবে কাজ করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যাতে বাঞ্চিত প্রক্ষোভের বিকাশ হয়
এবং অবাঞ্চিত প্রক্ষোভ নিয়ন্ত্রিত হয়, তার ব্যবস্থা করা শিক্ষা কর্মসূচীর অন্যতম দায়িত্ব।
৪) নৈতিক বিকাশ – শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক বোধ সৃষ্টি করা,
নৈতিকতার অণুশীলন করা এবং ভবিষ্যতে নৈতিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নৈতিক বিকাশেরই অর্ন্তভুক্ত।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচী, যেমন- মনীষীদের জীবনী পাঠ, বিদ্যালয়ের প্রার্থনা,
সমাজসেবামূলক কাজ, বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর শ্রেণির শৃঙ্খলারক্ষার দায়িত্ব প্রদান
ইত্যাদির সাহায্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ ঘটানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের সুবিধা – ব্যক্তিতন্ত্রে বিশ্বাসী চিন্তাবিদরা এই লক্ষ্যের কিছু সুবিধার কথা তুলে ধরেন-
১) মানবশিশু পৃথিবীতে জন্মলাভ করে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য নিয়ে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কতকগুলি সাধারন এবং কতকগুলি বিশেষ প্রকৃতির হয়।
কেবলমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাই বিশেষ প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিকশিত করতে এবং সংরক্ষণ করতে সমর্থ হয়।
২) শিশু পৃথিবীতেআবির্ভাবের মুহুর্তে নিষ্লুষ অবস্থায় থাকে। পরিবেশই তাকে কলুষিত করে।
তাই সমাজ-পরিবেশের বাইরে তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরলে সে উন্নত ব্যক্তিত্বেরঅধিকারী হতে পারে।
৩) প্রতিটি ব্যক্তিই একক সত্তা। দলগত পদ্ধতিতে সকলকে প্রকসাথে না পড়িয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক
পদ্ধতির সাহায্যে পাঠদান করলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বকীয়তা বজায় থাকে এবং তারা নিজ নিজ ক্ষমতা অনযিায়ী শেখার সুযোগ পায়।
৪) মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল আত্মোপলদ্ধি। আত্মোপলদ্ধি ধ্বারাই ব্যক্তিরমধ্যে পরিপূর্ণতা আসে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে এই কাজটি সহজেই সম্পন্ন করা যায়।
৫) ব্যক্তির দ্বারা সমাজ গঠিত হয়। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির উন্নতি ঘটলে সমাজেরই উন্নতি হবে।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের অসুবিধা – এই সুবিধাগুলি সত্বেও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর অনেক ত্র“টিও আছে।
১) অতিরিক্ত মাত্রাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যক্তিকে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে।
ব্যক্তি তখন সমাজের কল্যানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কল্যাণকে বড়ো কেের দেখে।
২) ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষায় ব্যক্তিকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি অনভিজ্ঞতার কারনে কি করণীয় বা করণীয় নয় তা বুঝে উঠতে পারে না বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে ব্যক্তির ক্ষতি হয়।
৩) স¤পূর্ণভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা অসম্ভব। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা সমাজের ওপর নির্ভরশীল।
৪) ব্যক্তিকেন্দ্রিক লক্ষ্যের সমর্থনে মনোবিজ্ঞানের যে মত্ব রয়েছে তা ত্র“টিমুক্ত নয়।
কারণ ব্যক্তি ও সমাজ-পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব হয়।
৫) প্রত্যেকের জন্য পৃথক শিক্ষা অত্যন্ত ব্যায়বহুল এবং জটিল।
শিক্ষার ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিকাশের সুবিধা ও অসুবিধাগুলির সাপেক্ষে এই কথা বলা যায় যে,
কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক লক্ষ্যের মাধ্যমে শিক্ষার আধুনিক লক্ষপূরন তথা জাতীয় বিকাশ সম্ভব নয়।
- Get link
- X
- Other Apps
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment
What type of content you need?